কালিম্পং সফর – পাহাড়, মেঘ আর নির্ভেজাল শান্তির খোঁজে (এপ্রিল - মে ২০২৬)
ব্যস্ত শহুরে জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে কয়েক দিনের জন্য পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা অনেকদিন ধরেই ছিল। অবশেষে সেই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ নিল। গন্তব্য – কালিম্পং, পাহাড়ের কোলে এক শান্ত, নিরিবিলি ও অপরূপ সুন্দর শহর।
ট্রেন ও কালিম্পঙ পৌঁছানোর বাস
---------------------------------------
আমাদের যাত্রা শুরু হয় ২৯ এপ্রিল রাতে ১৩১৪৯ কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনের নির্ধারিত ছাড়ার সময় ছিল রাত ৮:৩০ মিনিট। সময়মতো ট্রেন ছেড়ে দেয়, আর শুরু হয় আমাদের বহু প্রতীক্ষিত পাহাড় সফর।
পরদিন, অর্থাৎ ৩০ এপ্রিল পূর্বনির্ধারিত সময় সকাল ৮:১০ মিনিটের আগেই আমরা পৌঁছে যাই শিলিগুড়ি জংশন স্টেশনে।
স্টেশন থেকে প্রায় ৭ মিনিট হেঁটে পৌঁছে যাই তেনজিং নোরগে বাস স্ট্যান্ডে। ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা NBSTC পরিচালিত সরকারি বাসে কালিম্পংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। জনপ্রতি বাসভাড়া ছিল মাত্র ₹১১১। পাহাড়ি রাস্তার বাঁক, তিস্তা নদীর মনোমুগ্ধকর দৃশ্য আর সবুজে ঘেরা পথ—সব মিলিয়ে বাসযাত্রাটাও ছিল ভীষণ উপভোগ্য।
![]() |
| সুন্দরী তিস্তা |
ফেরার দিন ছিল ২ মে। আমরা নিউ জলপাইগুড়ি (NJP) থেকে ১৩১১৬ শিয়ালদহ হামসফর এক্সপ্রেসে ফিরি। ট্রেনের নির্ধারিত ছাড়ার সময় ছিল রাত ৯:১৫ মিনিট, যদিও সেদিন ট্রেনটি প্রায় ১০টার দিকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে আসে। তবে দেরিতে ছাড়লেও ট্রেনটি নির্ধারিত সময়েই, অর্থাৎ পরদিন সকাল ৮:১০ মিনিটে শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছে যায়।
আমাদের থাকার ব্যবস্থা
----------------------------
কালিম্পংয়ে আমরা ছিলাম 'Flower Patch Homestay' তে। আগে থেকেই ফোন করে রুম বুক করা হয়েছিল এবং আমরা ₹১,০০০ অগ্রিম প্রদান করেছিলাম।
মোবাইল নম্বর: ৯৮৩২০৮১৩৮৩
হোমস্টের ভাড়া ছিল—
৩০ এপ্রিল: জনপ্রতি ₹১,৪০০ (ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার এবং থাকার ব্যবস্থা সহ)
১ মে: জনপ্রতি ₹১,২০০ (ব্রেকফাস্ট, ডিনার এবং থাকার ব্যবস্থা সহ)
এখানে দুইরকম রুম রয়েছে, কিছু রুম কটেজের মতো আর কিছু একটা বিল্ডিংয়ে দুটো ফ্লোরে। আমরা ছিলাম বিল্ডিংয়ের ওপরতলার একটি রুমে। রুম থেকে আশে পাশের পাহাড়ের খুব সুন্দর ভিউ ছিল, আকাশ পরিষ্কার থাকলে ঘর থেকেই তিস্তা নদী দেখা যাচ্ছিলো। রুমে পাশাপাশি দুটো আলাদা বেড ছিল কিন্তু অদ্ভুতভাবে রুমে কোনো কাবার্ড ছিলোনা। রুমের সাইজ এমন কিছু আহামরি নয়, আমাদের জামা কাপড় সব বিছানার ওপরেই রাখতে হয়েছিল। বাথরুমে গিজার ছিল।
লোকেশনের কথা যদি বলি, ডাম্বের চক থেকে হেঁটে খুব বেশি হলে মিনিট সাত, আটেক লাগে। অর্কিড হোটেলের ঠিক পরেই এটি, তবে বেশ খানিকটা নিচের দিকে নামতে হবে ঢালু রাস্তা দিয়ে, সঙ্গে বড়ো লাগেজ থাকলে বা বয়স্ক মানুষ থাকলে এটি এড়িয়ে চলুন।
আমরা ফোনে খুব কষ্ট করে বুক করেছিলাম, যেনোতেনোপ্রকারেন ফোনটা রাখতে পারলেই যেন বেঁচে যান এনারা।
খাবারের মান চলনসই, পরিমান মোটামুটি। আতিথেয়তা চলে যায় টাইপ, আমরা যেহেতু ভোটের সময় গেছিলাম, হোমস্টের মালিক বলছিলেন ওনাদের নাকি স্টাফ শর্টেজ রয়েছে।
খাবার দাবার খাওয়ার ব্যবস্থা মালিকের ঘরে, যেখানে পৌঁছতে হলে খোলা আকাশের তলা দিয়ে বেশ কিছু সিঁড়ি ভেঙে নিচে যেতে হয়। এবার তখন যদি বাইরে বৃষ্টি হয় তাহলে আপনাকে হয় ভিজতে হবে অথবা ছাতা হাতে করে খেতে যেতে হবে।
আমি কাউকে এটা রেকমেন্ড করবোনা, আগে থাকতে রুম বুক করে আসার কোনো দরকার আছে বলে মনে হয়না। ডাম্বের চকের আশে পাশে একটু ঘোরাঘুরি করলে এই বাজেটে অনেক ভালো হোটেল বা হোম স্টে পেয়ে যাবেন।
সাইটসীইং করার গাড়ির খরচ
----------------------------------
ডাম্বের চকের পার্শ্ববর্তী ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে অনেকজনের সাথে দরদাম করার পর, আমরা ১ ও ২ মে ঘোরার জন্য ও ২ মে সাইটসিইং শেষে একদম সোজা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ড্রপ, এরকম একটা প্রোগ্রামের জন্য ফাইনালি একজনের সাথে রফা হয় মোট ৯৫০০ টাকায়। এটার ব্রেকআপটা এরকম:
১ মে: ৪০০০ টাকা
২ মে (লোকাল সাইটসিইং): ২৫০০ টাকা
২ মে (কালিম্পঙ থেকে NJP): ৩০০০ টাকা
নাম ও মোবাইল নম্বর: DB Gurung (৭৬০২২২৪৬৩৫)
আমরা পুরো ট্যুরটা করেছিলাম মারুতি ওয়াগন আর গাড়িতে। শেষদিন কালিম্পঙ থেকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে ফিরেছিলাম মারুতি সুইফট ডিজায়ার গাড়িতে।
প্রথম দিন (৩০ এপ্রিল)
-------------------------
এদিন রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে, খাবার খেয়ে একটু জিরিয়ে তারপর বিকেল ৩:৩০ নাগাদ বেরোই আশপাশটা একটু ঘুরে দেখতে ও পরের দুইদিনের ঘোরার গাড়ি বুক করতে।
বেশ খানিকটা পায়ে হেঁটে এদিন দেখে নিয়েছিলাম,
১) মঙ্গল ধাম মন্দির
![]() |
| মঙ্গল ধাম মন্দির |
![]() |
| মঙ্গল ধাম মন্দিরের অভ্যন্তরে |
![]() |
| মঙ্গল ধাম মন্দির চত্বরে |
২) ম্যাকফার্লেন মেমোরিয়াল চার্চ (ভিতরে ঢুকতে পারিনি বন্ধ ছিল বলে)
![]() |
| ম্যাকফার্লেন মেমোরিয়াল চার্চ |
দ্বিতীয় দিন (১ মে)
--------------------
এদিন গিয়েছিলাম লাভা, রিশপ ও কোলাখামের দিকে। জায়গা ধরে বললে এদিন আমরা ক্রমানুসারে দেখে নিয়েছিলাম,
১) রিশপ পাইন ফরেস্ট ও ভিউ পয়েন্ট
![]() |
| রিশপ পাইন ফরেস্ট |
২) ছাঙ্গে ওয়াটারফলস (টিকিট ২০ টাকা জনপ্রতি)
![]() |
| ছাঙ্গে ওয়াটারফলস |
![]() |
| ছাঙ্গে ওয়াটারফলসের জল পাহাড়ের ঢাল বেড়ে গড়িয়ে এক গুহায় প্রবেশ করছে |
৩) লাভা মনাস্ট্রি
![]() |
| লাভা মনাস্ট্রি |
![]() |
| লাভা মনাস্ট্রির ভিতরে |
![]() |
| লাভা মনাস্ট্রি চত্বর থেকে বৃষ্টিস্নাত পাহাড়ে রামধনুর ছটা |
৪) লাভা পাইন ফরেস্ট ও ভিউ পয়েন্ট (টিকিট ২০ টাকা জনপ্রতি)
![]() |
| লাভা পাইন ফরেস্ট |
তৃতীয় (অন্তিম) দিন (২ মে)
------------------------------
এদিন আমরা দেখে নিয়েছিলাম কালিম্পঙের আশে পাশের দুই একটি জায়গার সাথে লোকাল জায়গাগুলি। ব্রেকফাস্ট সেরে একদম লাগেজ নিয়ে আমরা এদিন বেরিয়ে পড়েছিলাম। এদিন আমরা ক্রমানুসারে দেখে নিয়েছিলাম,
১) মুনসং ভিউ পয়েন্ট
![]() |
| মুনসং ভিউ পয়েন্ট |
২) জলসা বাংলো (টিকিট ২৫ টাকা জনপ্রতি)
![]() |
| জলসা বাংলো চত্বর |
৩) হনুমান মন্দির/পার্ক (অনেকে এটাকে হনুমান টক ও বলেন)
![]() |
| হনুমান মন্দির |
৪) দূর্গা মন্দির
![]() |
| দূর্গা মন্দির |
৫) দলাপচান বুদ্ধিস্ট মনাস্ট্রি
![]() |
| দলাপচান বুদ্ধিস্ট মনাস্ট্রি |
৬) কালিম্পঙ সাইন্স সেন্টার (টিকিট ৪০ টাকা জনপ্রতি, চারচাকার জন্য পার্কিং চার্জ ৫০ টাকা)
![]() |
| কালিম্পঙ সাইন্স সেন্টারের ভিতরে |
![]() |
| কালিম্পঙ সাইন্স সেন্টার চত্বরে |
৭) ডেলো পার্ক
![]() |
| ডেলো পার্ক |
![]() |
| ডেলো পার্কের ভিতরে ডেলো ট্যুরিস্ট লজ |
৮) ত্রিরত্ন বুদ্ধ পার্ক
![]() |
| ত্রিরত্ন বুদ্ধ পার্ক |
![]() |
| ত্রিরত্ন বুদ্ধ পার্ক |
৯) পাইন ভিউ নার্সারি (টিকিট ২০ টাকা জনপ্রতি, চারচাকার জন্য পার্কিং চার্জ ৩০ টাকা)
![]() |
| পাইন ভিউ নার্সারিতে |
![]() |
| পাইন ভিউ নার্সারিতে |
১০) দুরপিন মনাস্ট্রি
![]() |
| দুরপিন মনাস্ট্রি |
![]() |
| দুরপিন মনাস্ট্রি চত্বর থেকে দূরের ভিউ |
১১) মরগ্যান হাউজ (বাইরে থেকে)
![]() |
| মরগ্যান হাউজ |
১২) গল্ফ কোর্স (বাইরে থেকে)
![]() |
| গল্ফ কোর্স |
১৩) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত গৌরীপুর হাউজ
![]() |
| গৌরীপুর হাউজ |
![]() |
| গৌরীপুর হাউজ |
এরপর সোজা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের পথে রওনা হই।
বিশেষ কয়েকটি কথা
-------------------------
১) কালিম্পঙে যদি শহরের মধ্যে থাকতে চান তাহলে আমি সাজেস্ট করবো আপনারা ডাম্বের চকের আশে পাশেই থাকুন, কারণ এখান থেকে গাড়ি, বাস, মার্কেট সব কিছুই হাতের নাগালে। শহরের মধ্যস্থল হওয়ার জন্য ঘিঞ্জি, রাস্তাও অপরিসর কিন্তু সেন্টার লোকেশনে থাকার যা যা সুবিধা, সব কিছুই এখানে পাবেন। এখানে প্রচুর হোটেল, হোম স্টে আছে, আগে থেকে বুক করে আসার দরকার নেই, এখানে এসে দেখে শুনে দরদাম করে রুম নিন।
২) দ্বিতীয় দিন আমরা গিয়েছিলাম লাভা, রিশপ ও কোলাখামের দিকে। বেশির ভাগ মানুষ সাধারণত লাভা, লোলেগাঁও, রিশপ এই তিনটে জায়গায় যান এবং ড্রাইভাররাও সেটাকেই বেশি করে এনকারেজ করে। এর প্রধান কারণ হলো, কোলাখামের রাস্তা, যার অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। এবারে আসি ছাঙ্গে ওয়াটারফলসের কথায়, মনে রাখবেন এখানে কিন্তু আপনাদের প্রচুর সিঁড়ি ভেঙে নিচে যেতে হবে, তাই যাদের কোমর বা হাঁটুর বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে, তারা এটিকে অবশ্যই এড়িয়ে চলুন। যারা শারীরিক ভাবে আপাতভাবে সুস্থ কিন্তু ফিটনেস সেরকম ভালো নেই, তারাও ভালো ভাবে চিন্তা ভাবনা করে তারপর এগোবেন। নিচে নামবার জন্য লাঠি ভাড়া পাওয়া যায়। এখানে কিন্তু প্রচন্ড জোঁকের উপদ্রব, ভালো করে ঢাকা পোশাক আশাক এবং জুতো পড়বেন অবশ্যই, আমি ক্রক্স পরে গিয়েছিলাম, ফেরবার সময় বুঝতেই পারিনি কখন তিনখানা জোঁক আমার ডান পায়ের জুতোর মধ্যে দিয়ে ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলো, এদিন এইজন্য প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল আমার, লাভা মনাস্ট্রির ওখানে গিয়ে ওষুধ কিনে লাগানোর পর পরিস্থিতি কন্ট্রোলে এসেছিলো, তাই সঙ্গে যথাযথ ওষুধও রাখবেন।
৩) দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে বেশ কয়েকটিতে আপনারা থাকতেও পারেন, যেমন জলসা বাংলো, ডেলো ট্যুরিস্ট লজ, মরগ্যান হাউজ ইত্যাদি। এবারে এগুলোর বুকিং প্রসেস ছোট করে বলি,
ক) জলসা বাংলোর বুকিংয়ের জন্য আপনাদের ইমেইল করতে হবে directordcomp@gmail.com এ।
খ) ডেলো পার্কের ভিতরে রয়েছে ডেলো ট্যুরিস্ট লজ। এটি GTA পরিচালিত। বুকিংয়ের জন্য কলকাতার সল্টলেকের গোর্খা ভবনে যোগাযোগ করতে হবে, মোবাইল নম্বর ৯৯০৩১৭৪০৪৭।
গ) মরগ্যান হাউজ WBTDCL এর ওয়েবসাইট থেকে বুক করা যায়।
৪) বাসে চেপে শিলিগুড়ি ফিরতে চাইলে টার্গেট রাখবেন দুপুর ৩ টের মধ্যে কালিম্পঙ বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছানোর।
উপসংহার
------------
মাত্র তিন দিনের এই কালিম্পং সফর আমাদের মনকে এক অন্যরকম শান্তি দিয়েছে। শহরের কোলাহল থেকে দূরে, পাহাড়ের নির্মল হাওয়া, মেঘে ঢাকা রাস্তা, তিস্তার সঙ্গ আর মানুষের আন্তরিক আতিথেয়তা—সব মিলিয়ে এই সফর দীর্ঘদিন মনে থেকে যাবে।
এই ব্লগে আমি আমাদের সম্পূর্ণ যাত্রাপথ, যাতায়াতের মাধ্যম, খরচ, থাকার ব্যবস্থা এবং প্রতিটি দর্শনীয় স্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আশা করি, যারা ভবিষ্যতে কালিম্পং ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের কাছে এই তথ্যগুলো উপকারী হবে এবং ভ্রমণ পরিকল্পনা করতে কিছুটা হলেও সাহায্য করবে।
ভ্রমণ শুধু নতুন জায়গা দেখা নয়; প্রতিটি সফর আমাদের নতুন কিছু শেখায়, নতুন স্মৃতি উপহার দেয় এবং আবারও কোথাও বেরিয়ে পড়ার ইচ্ছেটাকে আরও গভীর করে তোলে। কালিম্পংও আমাদের কাছে ঠিক তেমনই এক সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকবে।
#Kalimpong #MountainLife #NorthBengal #TravelGuide #Wanderlust #WestBengal #WestBengalTourism











































Comments
Post a Comment