দীঘা ডায়েরি: কিছু মুহূর্ত, কিছু স্মৃতি (ডিসেম্বর ২০২৫)

এই দীঘা ভ্রমণের পরিকল্পনাটা হঠাৎ করে নয়। অনেকদিন ধরেই মনে একটা ইচ্ছে জমে ছিল—নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির দর্শন। সেই ইচ্ছাকেই সামনে রেখে অবশেষে ঘুরে এলাম দীঘা থেকে ২ রাত ৩ দিনের এই ছোট্ট প্রোগ্রামে। দীঘা এতো কাছে হওয়া সত্ত্বেও এযাবৎ এটি ছিল আমার দ্বিতীয় বারের জন্য দীঘা ভ্রমণ। এর আগে দীঘা গিয়েছিলাম প্রায় ২২ বছর আগে, যার আর সেরকম কিছু আজ আর মনে নেই। 

নিউ দীঘা সমুদ্র সৈকতে সূর্যোদয়

ট্রেন
-----

১৩ ডিসেম্বর সকাল ৬:৪৫ এর ১২৮৫৭ তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসে যাত্রা শুরু।

১৫ ডিসেম্বর সকাল ১০:৩৫ এর ১২৮৫৮ তাম্রলিপ্ত এক্সপ্রেসে বাড়ি ফেরা। এদিন ট্রেন ৫ ঘন্টারও পরে দুপুর প্রায় ৩:৩৫/৪০ নাগাদ দীঘা থেকে ছেড়েছিলো।

হোটেল ও রুম ট্যারিফ 
--------------------------

আমরা ছিলাম দীঘা স্টেশন থেকে মাত্র ৩৫০ মিটার দূরে মেইন রোডের ওপরেই অবস্থিত 'Hotel Park Point' এ।

আমি রুম (Super Deluxe Room) বুক করেছিলাম Agoda অ্যাপ থেকে, সাথে ২ দিনের ব্রেকফাস্ট জুড়েছিলাম, সব মিলিয়ে টোটাল ৪৯৫০ টাকা লেগেছে আমাদের।

এনাদের নিজস্সো রেস্তোরাঁ রয়েছে, যেখানে সবরকমের খাবার দাবার পাওয়া যায়, তবে দাম একটু বেশির দিকে। 

ব্রেকফাস্ট ব্যুফে ছিল, অনেক রকম আইটেম ছিল তাতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, যেমন পুরি-সবজি, উপমা/পোহা, সিদ্ধ ডিম, ফল, স্যান্ডউইচ, ডিম ভুরজি, চা, কফি, ফ্রুইট জুস ইত্যাদি অনেক কিছু।

চেক ইন বেলা ১২ টা, চেক আউট সকাল ১১ টা।

রুম রিভিউ
------------

আমাদের রুম ছিল থার্ড ফ্লোরে। আকার আয়তনে রুমটি বেশ বড়োই ছিল। লিফ্ট রয়েছে এখানে|

কিং সাইজ বেড ছিল, সোফা, টেবিল ছিল, রোড ফেসিং ব্যালকনি ছিল। সব কিছুই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল। বাথরুমও ছিল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, গিজার ছিল।

রুমে ছিল ইলেকট্রিক কেটলি ও কিছু চায়ের ও গুঁড়ো দুধের স্যাশে। টয়লেট্রিজ রাখা ছিল বাথরুমে। একটা বড় ওয়ার্ডরোব ছিল, আয়নাও ছিল।

ফ্রি ওয়াইফাই ফাস্ট ছিল, ভালো কাজ করেছে। 

এসি ছিল কিন্তু শীতে কোনো প্রয়োজন পড়েনি। টিভি ছিল কিন্তু আমরা চালাইনি তাই বলতে পারবোনা কন্ডিশন ঠিক ছিল কিনা।

আমাদের রুম

আমাদের রুম

আমাদের রুমের বাথরুম

আমাদের রুমের বাথরুম

সাইটসীইং করার অটোর খরচ
----------------------------------

রাস্তা থেকেই নানান জনের সাথে দরদাম করে, অটো-টোটো বিভিন্ন অপশন ঘেঁটে, শেষে দুদিন ঘোরার জন্য একটি অটো ঠিক করি।

দুদিনের জন্য মোট ১৪০০ টাকা (৭০০+৭০০) নিয়েছিল আমাদের।  

(মোবাইল নম্বর: কমল সাঁতরা ৯০২৯৬৬৩৯৬৪)

প্রথম দিন (১৩ ডিসেম্বর)
---------------------------

এদিন রুমে ঢুকে লাগেজ রেখেই বেরিয়ে পড়েছিলাম আমাদের হোটেলের একদম উল্টোদিকেই অবস্থিত ১) অমরাবতী পার্ক দেখতে। 

অমরাবতী পার্ক

এরপর খাওয়া দাওয়া সেরে রুমে ফিরে এসে স্নান করে একটু রেস্ট নিয়ে আগে থাকতে ঠিক করে রাখা অটোয় বেরিয়ে পড়েছিলাম এইসব জায়গাগুলো দেখতে (ক্রমানুসারে),

২) মোহনা

দীঘা মোহনা, বাঁদিকে চম্পা নদী, ডান দিকে বঙ্গোপসাগর

৩) শংকরপুর সমুদ্র সৈকত 

শংকরপুর সমুদ্র সৈকত

৪) নায়েকালী মন্দির

নায়েকালী মন্দির

নায়েকালী মাতার বিগ্রহ

৫) জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি 

জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি

জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ির বিগ্রহ

জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ির বিগ্রহ

জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ির বিগ্রহ

জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ির পাশেই অবস্থিত নতুন মন্দির

নতুন মন্দিরের বিগ্রহ

৬) নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির 

নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির

নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির

নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরের রথগুলি

প্রসঙ্গত বলি, আমাদের ঠিক করে রাখা অটো কিন্তু ২-৫ নম্বর জায়গাগুলি দেখিয়ে আমাদের জগন্নাথ মন্দিরের সামনে নামিয়ে দিয়েছিলো। ফেরার সময় সেখান থেকে আমরা একটি টোটো ধরে ৭) নিউ দিঘা সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় দিন (১৪ ডিসেম্বর)
----------------------------

এদিন বেরোতে একটু বেলা হয়ে গিয়েছিলো, সকাল প্রায় ১১ টা নাগাদ এদিন আমরা বেড়িয়ে একে একে দেখে নিয়েছিলাম (ক্রমানুসারে),

১) ওশিয়ানা সমুদ্র সৈকত 

ওশিয়ানা সমুদ্র সৈকত, ডানদিকে দূরে উদয়পুর সমুদ্র সৈকত দেখা যাচ্ছে

২) বাজিতপুর রাধা গোবিন্দ মন্দির 

বাজিতপুর রাধা গোবিন্দ মন্দিরের প্রবেশদ্বার

৩) তালসারি সমুদ্র সৈকত

তালসারি সমুদ্র সৈকত
 

৪) চন্দনেশ্বর মন্দির 

চন্দনেশ্বর মন্দির চত্বর

চন্দনেশ্বর মন্দির চত্বর

চন্দনেশ্বর মন্দির চত্বরে থাকা পুকুর

চন্দনেশ্বর শিব

চন্দনেশ্বর মন্দিরের অন্যান্য বিগ্রহ

চন্দনেশ্বর মন্দিরের অন্যান্য বিগ্রহ

এরপর হোটেলে ফিরে স্নান সেরে কিছুক্ষন বিশ্রাম নিয়েছিলাম। তারপর সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম,

৫) ঢেউসাগর পার্ক 

ঢেউসাগর পার্ক

ঢেউসাগর পার্কের ভিতরে

ঢেউসাগর পার্কের ভিতরে

৬) ওল্ড দীঘা সমুদ্র সৈকত 

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

ওল্ড দীঘার সুসজ্জিত সমুদ্র সৈকত

তৃতীয় দিন (১৫ ডিসেম্বর)
----------------------------

এদিন হিসেবমতো সকাল ১০:৩৫ এ আমাদের ফেরার ট্রেন ছিল, তাই এদিন আর দূরে কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করিনি, যদিও সেই ট্রেন এদিন দিঘা ছেড়েছিলো বিকেল ৩:৩৫/৪০ নাগাদ। সকালে এদিন শুধু নিউ দীঘা সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিলাম এবং একটি স্পিড বোটে চড়ে সমুদ্রে খানিকটা ঘুরেছিলাম, ওরা বলেছিলো ১৫ মিনিট ঘোরাবে কিন্তু খুব বেশি হলে ৭-৮ মিনিট মাত্র ঘুরিয়েছিলো, খরচ হয়েছিল বেশ ভালোই, মাথা পিছু ৩০০ টাকা করে, যদিও আমরা এই রাইডটা খুবই উপভোগ করেছিলাম। 

বিশেষ কয়েকটি কথা
------------------------

১) দীঘা আমি অনেক বছর পরে গেলাম তাই বলতে পারবোনা এরকমটা আগে থেকেই ছিল কিনা। জগন্নাথ মন্দির হওয়ার সাথে সাথেই পুরীর রোগটা দীঘাতেও সংক্রামিত হয়েছে, অটো/টোটোয় উঠলেই এক ধাক্কায় গাদাখানেক টাকা চেয়ে বসছে। আমরা যারা কলকাতা হাওড়ায় বা আশেপাশে থাকি, তাঁদের কাছে এই ব্যাপারটা খুবই বিরক্তিকর। স্বল্প দূরত্ব যেতে হলেও এক ধাক্কায় ১০০/১৫০ টাকা এক একবারে উড়ে যাওয়া জলভাত হয়ে দাঁড়িয়েছে এখানে এবং এই জঙ্গলরাজ সম্পূর্ণ ভাবে সরকারি মদতে চলছে যা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার।

২) জগন্নাথ দেবের মন্দিরে ঢোকার গেটের অনেক আগে জুতো খুলতে হয়, কিন্তু এরপর খালি পায়ে প্রবেশদ্বার অব্দি যে পথটা অতিক্রম করতে হয়, সেই পথ ধুলোবালি, অজস্র ছোট বড় পাথরে ভরা, যা পায়ে ফুটে বা পা মচকে আঘাত লাগার সম্ভাবনা যথেষ্ট, কর্তৃপক্ষের এই দিকে নজর দেওয়া উচিত।

৩) জগন্নাথ দেবের মন্দিরের ভিতরে যেহেতু সবাই খালি পায়ে প্রবেশ করে, তাই এর ভিতরে থাকা শৌচালয়ে সবাই খালি পায়েই যায় আর তার ফলে শৌচালয় চত্বরের মেঝে নরকের চেহারা নিয়েছে, চার দিকে জল কাদায় ভর্তি, অসাবধানতা বশত কেউ স্লিপ করে পড়েও যেতে পারেন। মন্দির কর্তৃপক্ষের এই দিকে নজর দেওয়া উচিত।

৪) তালসারি সমুদ্র সৈকতে লাল কাঁকড়ার বিশাল আনাগোনা। তাছাড়া এখানে সুবর্ণরেখা নদী এসে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। লাল কাঁকড়া দেখার তিনটি ভালো উপায় রয়েছে এখানে, 

ক) পায়ে হেঁটে এক্সপ্লোর করা।

খ) সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমেই দেখবেন কিছু ছেলে পুলে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, মাথাপিছু ১০০ টাকার বিনিময়ে ওরা সমুদ্র সৈকতের বেশ খানিকটা ঘুরিয়ে দেখায়। আমরা প্রথমে এভাবেই দেখেছিলাম।

গ) মোটর চালিত নৌকায় চড়ে সুবর্ণরেখা ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী চরে যাওয়া। আধ ঘন্টা মতো সময় দেবে আপনাকে চরে ঘুরে বেড়াবার জন্য । তবে নৌকায় ঘুরতে হলে আপনারা যদি সংখ্যায় কম থাকেন তাহলে হয় আপনাকে পুরো নৌকা ভাড়া নিতে হবে, সেক্ষেত্রে ৮০০-১০০০ টাকা লাগবে, নাহলে নৌকা ভর্তি হওয়া অব্দি অপেক্ষা করতে হবে। আমরা বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর অবশেষে একটি নৌকা পাই, আমাদের তাতে মাথাপিছু খুব সম্ভব ১০০ টাকা করে লেগেছিলো। 

সুবর্ণরেখা ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী চরে আমরা এই বোটেই এসেছিলাম

সুবর্ণরেখা ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী সেই চর

সুবর্ণরেখা ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী সেই চরে নদী ও সমুদ্রের মিলনস্থল

তবে যদি শুধু লাল কাঁকড়া দেখার কথা বলেন, তাহলে বলবো আমরা বাইকে করে যে ঘুরেছিলাম প্রথমে, তাতে অনেক বেশি লাল কাঁকড়া দেখতে পেয়েছিলাম।

তালসারি বিচে প্রচুর লাল কাঁকড়া

সুবর্ণরেখা ও বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী সেই চরে বালি খুঁড়ে ভিতর থেকে বের করে আনা লাল কাঁকড়া

৫) নিউ এবং ওল্ড, দুই দীঘাই ঘুরলাম এবং ঘুরে যা বুঝলাম বর্তমানে ওল্ড দীঘাতেই থাকা উচিত। ওল্ড দীঘা অনেক বেশি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সমুদ্রের ধারের রাস্তা খুব সুন্দর ভাবে সাজানো, গোছানো ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সন্ধ্যার পরে এখানে বসে থাকতে দারুন লাগে। নিউ দীঘা খুবই অপরিচ্ছন্ন। বর্তমান সরকার ও প্রশাসন ওল্ড দীঘায় এতো ভালো কাজ করেছে কিন্তু তাঁরাই নিউ দীঘা নিয়ে এতটা উদাসীন কেন কে জানে!

৬) জগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদ বিভিন্ন রকমের হয় এমনকি প্রাতঃরাশও (লুচি-সবজি)। দুপুরের মহাপ্রসাদের জন্য আগের দিন থেকে সেই দিন সকাল ১০ টা অব্দি এবং সন্ধ্যার মহাপ্রসাদের জন্য বেলা ১১ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত বুকিং নেওয়া হয়। মহাপ্রসাদের জন্য ফোন করতে পারেন এই নম্বরে, ৯০৫৯০ ৫২৫৫০। শুকনো মিষ্টি প্রসাদ ও খিচুড়ি ভোগ মন্দিরে গিয়েই কিনতে পারবেন।

৭) নায়েকালী মন্দিরে প্রতি সপ্তাহে শনি, রবি, সোম ও মঙ্গলবারে অন্নভোগ পাওয়া যায়। তার জন্য আপনারা আগে থাকতে যোগাযোগ করতে পারেন এই দুটি নম্বরে, ৯০৬৪৯৩৬২৫৬/৯৪৩৪৩০০৪০০।

#digha #purbamedinipur #eastmidnapore #dighatrip #sea #beach #weekendtripfromkolkata #westbengal #westbengaltourism

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

একদিনের ছোট্ট সফরে রিষড়া-কোন্নগর-শ্রীরামপুর

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বোড়ালের ত্রিপুরসুন্দরী মন্দির