হাওড়ার ডোমজুড়ের নারনা পঞ্চানন/পঞ্চানন্দ মন্দির
হাওড়া জেলার ডোমজুড় ব্লকের অন্তর্গত নারনা গ্রামে এই মন্দিরটি অবস্থিত। শোনা যায়, পঞ্চানন্দের এই মন্দিরটির বয়স নাকি পাঁচশো (মতান্তরে ৮০০) বছরেরও বেশি। গ্রামের পশ্চিম দিকে রয়েছে বিরাট এক অশ্বত্থ গাছ। তার নীচে রয়েছে নারনা পঞ্চানন দেবের মন্দির।
মন্দির প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জনশ্রুতি ও ভক্তদের বিশ্বাস
-------------------------------------------------------------
কথিত আছে, তুবারাম (মতান্তরে তুলারাম) ঘোষ নামে এই গ্রামের এক বাসিন্দা পঞ্চানন দেবের স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন যে পাশের পুকুরে দেবতা আছেন। পরদিন সকালে তিনি পুকুরে গিয়ে দেখতে পেয়েছিলেন যে, সেখানে একটি ঘট রয়েছে। তিনি সেটিকে তুলে এনেছিলেন। কিন্তু, ঘটটিকে নিয়ে এলে কীভাবে তার পুজো করবেন, সেই ভেবে তিনি চিন্তায় পড়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত সাত-পাঁচ ভেবে তুবারাম ঘোষ ঘটটিকে আবার পুকুরেই ফেলে দিয়েছিলেন।
কথিত আছে, সেই রাতেই তুবারাম ঘোষ ফের স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। সেই স্বপ্নাদেশে বলা হয়েছিল, এক অশ্বত্থগাছ রেখে, সেই স্থানে যেন ঘটটির পুজো করা হয়। পুকুরে চাল ধুতে যাওয়ার সময় কয়েকটি চাল দিয়ে পুজো করলেই দেবতা সন্তুষ্ট হবেন। আর, দেবতার আশীর্বাদে একদিন তুবারাম ঘোষের পরিবারেরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে। সেইমতো পরদিন ওই পুকুরের পাড়ে তুবারাম ঘোষ গিয়েছিলেন। সেই সময় আশ্চর্যজনকভাবে দেখতে পেয়েছিলেন যে ঘট তিনি জলে ফেলে দিয়েছিলেন, তা পুকুরের ঘাটের পাশে রয়েছে। ঘটটিকে তুলে এনে এরপর তুবারাম ঘোষ একটি মাটির বেদি বানিয়ে তাতে স্থাপন করেছিলেন। আর, সেই বেদিতে পুঁতে দিয়েছিলেন অশ্বত্থ গাছের চারা। সেই দিন থেকেই নারনা পঞ্চানন দেবের পুজো শুরু হয়।
কথিত আছে, সেই দিনই তুবারাম ঘোষ আবারও স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন। স্বপ্নাদেশে তাঁকে বলা হয়েছিল, দেবতার ওই থানের মাটি পঙ্গু এবং পক্ষাঘাতগ্রস্তদের শরীরে লাগালে, তিনি আরোগ্য লাভ করবেন। আরোগ্য লাভ করলে ভক্তদের গঙ্গা থেকে জল এনে দেবতার স্থানে ঢালতে হবে। আর, সন্ন্যাস ব্রত পালন করতে হবে। সেই থেকে আজ পর্যন্ত অসংখ্য ভক্ত এই মন্দিরে ছুটে আসেন দূর-দূরান্ত থেকে। বহু অসুস্থ মানুষ এই মন্দিরে এসে হাতেনাতে ফল পেয়েছে বলেই দাবি ভক্তদের।
মন্দির চত্বর
--------------
মূল মন্দিরটি প্রায় চার শতক জমির ওপর রয়েছে। তার সাথে রয়েছে নাট মন্দির আর ভোগের মন্দির। পঞ্চানন মন্দিরটিতে ঢোকার ঠিক মুখেই রয়েছে রাধা গোবিন্দের একটি মন্দির।
![]() |
| সেই অশ্বত্থ গাছের নিচে বাবা পঞ্চাননের/পঞ্চানন্দের থান |
![]() |
| রাধা শ্যামসুন্দরের বিগ্রহ |
বিশেষ উৎসব
----------------
চৈত্র সংক্রান্তির ঠিক তিন দিন আগে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করে মেলা শুরু হয়ে যায়। চৈত্র সংক্রান্তির দিন মন্দিরে নীল পুজোর আয়োজন করা হয়। সেই পুজো এবং মেলা দেখতে দলে দলে লোকেরা আসেন বিভিন্ন জেলা থেকে। মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণার বহু মানুষের আগমন ঘটে। আসেন প্রচুর সন্ন্যাসীরাও। চৈত্র সংক্রান্তি ছাড়াও গাজনের মেলার সময় প্রচুর ভীড় হয় এই পঞ্চানন মন্দিরে। এখানে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে দেবতাকে খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হয়। শীতকালে দেওয়া হয় অন্যপদ। এখানে এখন প্রতিদিন ভক্তদের আসা-যাওয়া লেগেই থাকে। মানত পূরণ হলে, পাশের পুকুরে স্নান করে ভক্তরা দণ্ডী কেটে দেবতার পুজো দেন।
কিভাবে আসবেন
---------------------
এই মন্দিরে যেতে হলে ৬ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে কোনা হয়ে, জগদীশপুরের ওপর দিয়ে পৌঁছতে হবে।
ট্রেনে এলে, হাওড়া-আমতা শাখার ডোমজুড় রোড স্টেশনে নেমে টোটোয় আধঘন্টা মতো।
কলকাতার দিক থেকে বাসে এলে, K-11 বাসে ডোমজুড় এসে টোটোয় আধঘন্টা মতো। হাওড়া থেকে আসলেও একই উপায়ে পৌঁছে যাবেন এখানে।
গুগল ম্যাপে 'Narna Baba Panchanand Tala' লিখে সার্চ করলে সঠিক লোকেশন পেয়ে যাবেন।
মন্দিরের সামনের রাস্তা খুব বিশাল চওড়া নয়, চার চাকা নিয়ে এলে পার্কিংয়ের সমস্যা হতে পারে তবে দুই চাকায় সেরকম সমস্যা নেই।
সময়
------
অন্য আর পাঁচটা মন্দিরের সাথে সময়ের বিশেষ পার্থক্য নেই। দিনের বেলা পুজো দিতে হলে তা দুপুর ১ টা থেকে শুরু হয়। সন্ধ্যা বেলা ৬ টা নাগাদ আরতির পরও পুজো দেওয়া যায়।
সবশেষে একটা কথা না বললেই নয়, মন্দির এবং পার্শ্ববর্তী পুকুর চত্বরে পরিচ্ছন্নতার খুব অভাব, এই কারণে আমার আর সেরকম ছবি তুলতে ইচ্ছাই করেনি। মন্দির কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে এই দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
#howrah #domjur #narna #narnapanchananmandir #westbengal #westbengaltourism


Comments
Post a Comment